• শিরোনাম

    ফুটপাত থেকে শিল্পপতি হয়ে ওঠা সংগ্রামী জীবনের গল্প!

    | ১৮ নভেম্বর ২০২০ | ১১:১৩ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে 31 বার

    ফুটপাত থেকে শিল্পপতি হয়ে ওঠা সংগ্রামী জীবনের গল্প!

    শূন্য থেকে শিখরে উঠে আসা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত কর্মসফল দৃঢ়প্রত্যয়ী এক ব্যক্তিত্ব মো. আবুল কালাম আজাদ। গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি থাকলেও ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পোস্টার বিক্রি করতে দ্বিধা করেননি। সততা, বুদ্ধি আর পরিশ্রম তাঁকে আজকের অবস্থান নিয়ে এসেছে। পিতার ইচ্ছা শিক্ষক হওয়া, আর নিজের ব্যবসায়ী। এ নিয়ে পিতা-পুত্র মুখোমুখি। নানা ঘটনা চলছাতুরী। তারপরের কাহিনী অন্যরকম। একেবারেই ভিন্ন।

    ফুটপাথ থেকে অট্টালিকায়। মাঝে গড়িয়ে গেছে পদ্মায় অনেক জল। কিন্তু কিভাবে সম্ভব? না তেমন কিছুই না। ইচ্ছাই যথেষ্ট। আর তার ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে সবকিছু। ১৯৭০ সালের কথা। এসএসসি পরীক্ষার পর বাবার সাথে বাজারে গিয়েছিলেন পাটের বিনিময়ে ইলিশ মাছ ও কাঁঠাল কিনতে। সেখানে নারিকেল বিক্রয় করে লাভবান হওয়ার সুযোগ দেখে মাত্র ৪৫০ টাকা মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ছোট নৌকা করে শুরু করলেন এক হাট থেকে অন্য হাটে নারিকেল আনা নেওয়ার কাজ।



    জীবনে আরো বড় কিছু করার আশায় তিনি পাড়ি জমালেন শহরে। কিন্তু এখানেই শুরু হলো তাঁর কষ্টের জীবন। বায়তুল মোকাররমের সামনে পোস্টার বিক্রি করতে দেখে ঠিক করলেন এরকম একটি ব্যবসা করার। শুরু করলেন ‘আজাদ পোস্টার হাউজ’। এল রহমান জুয়েলার্স এর খাম্বার সামনে বিক্রি করা শুরু করলেন দেশ বিদেশের সিনেমার নায়ক নায়িকাদের পোস্টার। অনেকে উপহাস করলেও পিছন ফিরে তাকাতে চাননি তিনি। এভাবেই ছোট পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করতে করতে গড়ে তুললেন ‘আজাদ প্রোডাক্টস’।

    শূন্য থেকে উঠে আসা এই শিল্পপতি ১৯৫৪ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর জন্ম নেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার শ্রীকালিয়া মুন্সিবাড়ি গ্রামে। পরে পিতার চাকরির সুবাদে শরীয়তপুর জেলার ডামুঢ্যা উপজেলার বায়েশ্বর গ্রামে চলে যান। সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত ডানপিঠে থাকার কারণে পারিবারিকভাবেই সিদ্ধান্ত হয় ছোট্ট আবুল কালাম আজাদকে তার পিতার সঙ্গে থাকার।

    পিতা ছিলেন শিক্ষক এবং বিশিষ্ট আলেম। ৪০-৫০ গ্রাম এলাকাজুড়ে তার নামডাক ছিল। ওই এলাকায় তিনিই জানাজা নামাজ থেকে শুরু করে সকল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতেন। বায়েশ্বর আসার পর দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে দেয়া হয় তাকে। সেখান থেকেই তিনি প্রাইমারি পাস করেন। পরে তিনি নাগেরপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখান থেকেই তিনি এসএসসি পাস করেন।

    ১৯৭০ সালে এসএসসি পরীক্ষার দেয়ার পর রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত যে ৩ মাসের অবসর থাকে ওই সময়ের মধ্যে তিনি একটা ব্যবসার কথা ভাবতে লাগলেন। এদিকে এ সময়ের মধ্যেই তিনি তার মাকে হারালেন। একদিন তিনি বাবাকে ইলিশ মাছ কেনার আবদার করলেন। কথা মতো কালকিনি উপজেলার খাসেরহাটে পাট বিক্রি করে পিতার সঙ্গে ইলিশ মাছ কিনতে গেলেন।

    মাছ কিনতে গিয়ে দেখলেন পাশেই নারকেল বিক্রি হচ্ছে। ছোট্টবেলা থেকেই কোন কিছুর দাম জিজ্ঞেস করা ছিল আজাদের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য। বিক্রেতা জানালেন, ৮ আনা জোড়া। এর তিনদিন পর আবারও বাবার সঙ্গে শুকনা মরিচ, আম কাঁঠাল কিনতে গিয়ে অন্য একটি হাটে দেখলেন নারকেল বিক্রি হচ্ছে। সেখানে দেখলেন জোড়া ১০ আনা করে বিক্রি হচ্ছে।

    তখন তিনি বাবাকে তার নারকেল ব্যবসা করার ইচ্ছার কথা জানালেন। কিন্তু পিতা তাতে রাজি হননি। আজাদের পিতা সব সময়ই চেয়েছেন তার ছেলেও যেন শিক্ষক হয়। কিন্তু তার ঝোঁক সব সময় ব্যবসার প্রতি। পরে তার খালাতো ভাই হাসানের সঙ্গে পরামর্শ করেন। ওই সময় হাসানের কাছে ছিল ১০ টাকা আর আজাদের নিজের ছিল ৮ টাকা। এছাড়া হাসানদের একটি ভাঙ্গা নৌকা ছিল।

    সেটি কোনরকম মেরামত করে ওই ১৮ টাকা নিয়েই দু’জন মিলে শুরু করেন নারকেলের ব্যবসা। খাসেরহাট থেকে কিনে নৌকা করে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করতে থাকেন। একটু একটু করে লাভও হতে থাকে। একদিন বড় একটি নৌকা তাদের ভাঙ্গাচোরা নৌকাটিকে ধাক্কা দিলে ডুবে যায়। এটাই ছিল তাদের ব্যবসার প্রথম ধাক্কা। কিন্তু তারপরও থেমে থাকেনি। অবসরের ৩ মাসে প্রায় ১৮-১৯ হজার টাকার মতো লাভ হয়।

    ম্যাট্রিকের রেজাল্ট হওয়ার পর পিতার সেই একই কথা তুমি পিটিআই পড়ো এবং শিক্ষক হও। নিতান্তই সরল ছিল পিতার এই চাওয়াটা। কিন্তু আজাদের ইচ্ছা ছিল আরও লেখাপড়া করার। মামাকে মনের ইচ্ছের কথা খুলে বলতেই কলেজে ভর্তি করিয়ে দিলেন ডামুঢ্যা কলেজে। সে সময় মামা আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাককে বলে তার মামার বাড়িতে লজিংয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন।

    সেখান থেকে ১৯৭২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করলেন। এরপর পিতা আবার বললেন, এবার অন্তত পিটিআই পড়ো। কিন্তু তার ঝোঁক ছিল ব্যবসার দিকেই, একইসঙ্গে লেখাপড়ার প্রতিও টান ছিল। তিনি আবারও মামার কাছে গেলেন। কিন্তু মামা এবার বললেন, আমার তো তেমন টাকা-পয়সা নেই, তোমাকে আর পড়াতে পারবো না। ঠিক কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না সদ্য এইচএসসি পাস করা আজাদ।

    এ সময় খোঁজ পেলেন ওই গ্রামের একজন লোকের যিনি ঢাকার মাতুয়াইলে একটি মাটির মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি গ্রামে এলে একদিন সুযোগ বুঝে হুজুরের কাছে গিয়ে বললেন, তাকে ঢাকায় নেয়ার জন্য। হুজুর বললেন, তোমার বাবা বললে নেব। কিন্তু বাবা হুজুরকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কোনক্রমেই তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া চলবে না।

    তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন, হুজুর কবে ঢাকায় যান। গোপনে হুজুরের স্ত্রীর কাছে দিনক্ষণ শুনে নিয়ে নির্ধারিত দিনে লঞ্চে উঠেন। লঞ্চটি চাঁদপুর পার হওয়ার পর হুজুরের সঙ্গে দেখা করলেন। আজাদ জানতেন এখান থেকে হুজুর তাকে ফেরত দেবে না। হুজুরের সামনে গিয়ে বললেন, আমি কিন্তু আপনার সঙ্গে ঢাকায় যাচ্ছি। তার অদম্য আগ্রহের কাছে হুজুর হার মানলেন।

    সঙ্গে করে ঢাকায় এনে ডেমরার মাতুয়াইলে টিএনটি অফিসের টেলিফোন অপারেটর রফিক সাহেবের সংসারে লজিংয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। ৪ মাস পর আশ্রয়দাতা রফিক সাহেব কাতর মুখে বললেন, আমার তো সামান্য চাকরি, আপনাকে আর রাখতে পারছি না। তবে আপনার জন্য সুখবর হলো আরেকটা ভালো লজিং ঠিক করেছি। আমার বোনের বাড়িতে, তার দুই মেয়ে এক ছেলেকে পড়াবেন।

    পরে জানতে পারেন অঙ্কে কাঁচা থাকায় শিক্ষক হিসেবে অতটা ভাল না হওয়ায় লজিংটা চলে যায়। দ্বিতীয় লজিংয়ে থাকার সময় তিনি ভর্তি হলেন শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজের ডিগ্রিতে। আগের লজিংবাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত আরও দুটো টিউশনি শুরু করেন। এখানে তিনি করেন ৫ টি টিউশনি। সে সময় টিউশনি ছিল ৪০-৪৫ টাকা করে।

    এ সময় হাজি ওসমান গণি রোডে একটি টিউশনি করতেন ৪০ টাকায়। কিছুদিন পর ওই পরিবারের আরেকজন শিক্ষার্থী যোগ হলে তিনি বলেন আগে তো একজন পড়তা আর এখন পড় দুইজন। তোমার বাবাকে ১০ টাকা বাড়িয়ে দিতে বলো। এরপর টিউশনিটা চলে যায়। এই সময় পিতা বারবার চিঠি দিতেন একটা কিছু করার জন্য। দিন কাটতে লাগলো। ঢাকা শহরে ঘুরতে লাগলেন কিছু করার জন্য।

    এরই মধ্যে বিএ পাস করলেন। তিনি তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। ওই সময় মাত্র ৬ ভাগ শিক্ষার্থী পাশ করেন। তারপর থেকেই শুরু হলো নতুন চিন্তা। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে চাকরি করা বাধ্যতামূলক। এসময় চিন্তা করতে লাগলেন লজিং থাকবেন কিনা। তারাও খুব বেশি সন্তুষ্ট হতে পারছেন না কারণ তিনি চাকরির খোঁজার জন্য সময় দেয়ার কারণে ছেলেমেয়েদের দিকে মন দিতে পারছিলেন না।

    এর মধ্যে লজিংয়ের একটি মেয়েকে পছন্দ করে ফেলেন। মেয়েটিও তাকে পছন্দ করতো। পরে গার্জিয়ানের কানে এ কথা গেলে এ লজিংটিও চলে যায়। তখন তিনি ভাবলেন আজ বেকারত্বের কারণেই আমার এই অবস্থা। মনের ভিতর একটা ক্ষোভ তৈরী হল। চেপে বসলো জেদ। সিদ্ধান্ত নিলে তাকে বড় হতে হবে।

    এদিকে বিয়ে পাস করার পর ল-তে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে লজিং চলে যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে এমএ-তে অধ্যয়নরত বন্ধু আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীরের কাছে ওঠেন। ওই বন্ধু থাকতেন মুহসিন হলের ৪১০নং রুমে। বহিরাগত হিসেবে সমস্যা হওয়ায় ২ মাস পর তিনি মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে ৪৫ টাকায় একটি রুম ভাড়া করেন। শুরু হয় নতুন জীবন।

    আইনে প্রিলিমিনারি কমপ্লিট করলেন। কিন্তু টাকার অভাবে পরের বছর বই কিনতে পারেননি। ফলে ফাইনাল পরীক্ষাটা আর দিতে পারেননি। জীবিকার সন্ধানে এখানে সেখানে ছোটাছুটি। পুরো ঢাকা শহর চষে বেড়াতে লাগলেন। টিউশনি করেন আর সারা দিন পথে পথে ঘুরেন- সদরঘাট, নিউ মার্কেট, বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তান, মতিঝিল। দেখতে লাগলেন কে কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করে।

    এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন সংসদ ভবন এলাকায় একটি এক্সিভিশনে গিয়ে দেখেন একজন স্কেল বিক্রি করছেন। ছেলেটি দেখতে সুন্দর, স্মার্ট। তার মনে হলো, এ রকম একটা ব্যবসা তো তিনিও করতে পারেন। স্কেলের গায়ে লেখা আছে ‘মেড ইন চায়না’। বাংলাদেশে এ স্কেলটা কোথায় পাওয়া যায়? স্কেল বিক্রি করলে কত আয় হয়? এমন আরো অনেক প্রশ্ন জেগে উঠল মনে।

    কাছে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলেন, ভাই আপনি এই স্কেল বিক্রি ছাড়া আর কিছু করেন? বিক্রেতা জবাব দিলো, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। বললেন এ ধরনের কাজ করতে আপনার লজ্জা করে না। তিনি জবাব দিলেন আমি তো চুরি করি না। একটা টিউশনি করি আর অবসর সময়ে স্কেল বিক্রি করি। এ টাকা বাড়িতে পাঠায়। সেখানে ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ চলে।

    সঙ্গে সঙ্গে স্কেল ব্যবসার চিন্তা মন থেকে বাদ দিয়ে দিলেন। কারণ তার মনে হলো, এ ব্যবসাটা এমন একজন করে যার গ্রাামে দু’জন ভাইবোন আছে, যাদের লেখাপড়ার খরচ এখান থেকে চলে। সুতরাং তার ব্যবসায় ভাগ না বসিয়ে অন্য কিছু খুঁজতে থাকেন। তবে তার কাছ থেকে আবুল কালাম আজাদ অনুপ্রেরণা পেলেন। আবারও ঘুরতে লাগলেন।

    ঘুরতে ঘুরতে একদিন চলে আসলেন স্টেডিয়ামের কাছে। হঠাৎ চোখে পড়ে গেল এক ননবেঙ্গল লোক স্টেডিয়ামের লোহার গেটের সঙ্গে লম্বা করে রশি টানিয়ে বিভিন্ন পোস্টার বিক্রি করছে। পোস্টারে ফুটে আছে সে সময়ের জনপ্রিয় মুখ এলভিস প্রিসলি, অলিভায়া নিউটন, জন বনিয়েম, জন ট্রাভোলটা, কাবা শরিফ, মদিনা শরিফ ইত্যাদি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পোস্টারগুলো দেখছিলেন।

    হঠাৎ পোস্টার বিক্রেতার এক বন্ধু এসে বললো, বহুত তো কামাইতেছিস, চা খিলা। ১০ টাকার জিনিস ২০ টাকা বিক্রি করতাছিস। তিনি ভাবলেন এত লাভ এই ব্যবসায়। কানে ‘বহুত কামানো’ কথাটা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই কান দুটো আরও খাড়া করে ফেললেন বেকার আজাদ। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিলেন, এই ব্যবসাটাই তিনি করবেন। হলে গিয়ে বন্ধুকে বললেন সিদ্ধান্তের কথা।

    বন্ধু উচ্চস্বরে হেসে বললো তুমি করবা এ ব্যবসা। আরে মিয়া চাকরি খোঁজো, ব্যবসা করতে অনেক টাকা লাগে। আজাদ এসব কথায় কান দিলেন না। সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন। কিন্তু এ পোস্টারগুলো কোথায় কিনতে পাওয়া যায় কিছুই জানেন না। উত্তর জানার আশায় পোস্টার বিক্রেতার কাছাকাছি ঘুর ঘুর করতে লাগলেন। দ্বিতীয় দিন পোস্টার বিক্রেতা ধমকের সুরে বললেন এই মিয়া ঘুর ঘুর করতাছ ক্যান?

    বিষয়টা কি? তিনি বললেন আপনি এমন করতাছেন কেন? আমি তো আপনার ডিসটার্ব করছি না। আমি তো পোস্টার কিনবো। কিন্তু ছাত্র মানুষ আমার তো অনেক টাকা নেই। এমনকি পরদিন বিক্রেতার এ কথার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বহু কষ্টে ২৫ টাকা দিয়ে একটি গোলাপ ফুলের পোস্টার কিনলেন তিনি। কেনার পর জিজ্ঞেস করলেন পোস্টারগুলো কোত্থেকে আনেন? পোস্টার বিক্রেতা চমকে উঠে বললো, কেন এ ব্যবসাটা করবে নাকি? যান ফোটেন।

    এ কথা জিদটা চেপে গেল তখনই। যে কোনও উপায়েই হোক, পোস্টার কোথায় পাওয়া যায়, তা বের করতে হবে। পোস্টার বিক্রেতাকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ঠিক যেন হুজুরের পেছন পেছন ঢাকা আসার মতো। সারা দিনের বিক্রি শেষে যখন বাড়ি ফিরছিল, আজাদও দূর থেকে তাকে অনুসরণ করে মিরপুর পর্যন্ত গেলেন। প্রথম জীবনে ঢাকায় আসা হুজুরকে অনুসরণ করার মতো।

    মিরপুরে যে জায়গায় পোস্টার বিক্রেতা নামলো, পরদিন খুব সকালে ওই জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ভাবলেন পরদিন লোকটা এখানে এসে বাসে উঠবে। পরদিন বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর লোকটি এসে বাসে উঠল, তিনিও চুপিচুপি পিছু নিলেন। বাস এগিয়ে চলছে গুলিস্তান, ঠাটারীবাজার, নবাবপুর রোড হয়ে সদরঘাট।

    লোকটি সদরঘাটের আগেই কোর্ট-কাচারির সামনে নামলো এবং সোজা ঢুকে গেল একটি দোকানে। লোকটির পিছু পিছু তিনিও এগুলেন। দোকানের কাছাকাছি এসে বুঝতে পারলেন পোস্টারগুলো কোথা থেকে কেনে লোকটি। দোকানটির নাম ছিল জাহাঙ্গীর গ্লাস হাউজ। ঢাকাইয়া এক ভদ্রলোক পোস্টারগুলো বিক্রি করেন। আবিষ্কারের আনন্দে বুকটা তখন কাঁপছে আজাদের।

    ফিরে এসে পুরানো বই-খাতা সব বিক্রি করে দিলেন। এতে দাঁড়ালো ৪৫০ টাকা। পরের দিন ওই দোকানে গিয়ে মুরব্বি গোছের লোকটিকে বললেন ‘চাচা আপনি কি আপনার কাছে পোস্টার বিক্রি করবেন। এ কথা শুনে তিনি বললেন কেন বিক্রি করবো না। আজাদ বললেন চাচা আমি তো বিএ পাস করে বেকার। তাই এ ব্যবসা করতে চাই, বই-খাতা বিক্রি করে এসেছি।

    নরম দিলের লোকটি বললেন কোন সমস্যা নেই। আমি আছি। দোকানদার ৫০ টাকার বেশি পোস্টার দিল। পোস্টারগুলো নিয়ে ওইদিন আর বিক্রি করতে যাননি। পরদিন সোজা চলে গেলেন স্টেডিয়ামের কাছে। মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে যে বাড়িতে ভাড়া ছিলেন ওই বাসার এক ছেলে মকবুলকে নিয়ে মোহামেডান ক্লাবের পাশে একটি জায়গায় দড়ি বেঁধে পোস্টারগুলো সাজালেন।

    ঠিক করলেন একটু কম দামে অথচ পরিমাণে বেশি পোস্টার বিক্রি করবেন তিনি। দু’টো পোষ্টার তিনি ৩৫ টাকায় বিক্রি করলেন। এটাই ছিল তার জীবনের প্রথম পোস্টার বিক্রি। এরপর তিনটি বিক্রি করলেন ৫০ টাকায়। টার্গেট কম দামে বেশী বিক্রি করা। তাছাড়া যার কাছ থেকে পোস্টারগুলো আনতেন তিনিও আন্তরিকভাবে সহযোগিতার কথা বলেছিলেন। আবার অনেকেই তার জীবনের গল্প শুনে বেশি দাম দিতেন।

    এর মধ্যে ওই পোস্টার বিক্রেতা জেনে যায়, নতুন একটা দোকান হয়েছে। সেটা দেখে বিক্রেতা ক্ষুব্ধ হয়ে বলে এজন্যই এতদিন আমার কাছে ঘুর ঘুর করেছ তুমি? আমার ব্যবসায় ভাগ বসাইল্যা! বিক্রেতা নীরবে শাসিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন পুলিশ এসে আজাদের দোকানটা তছনছ করে ফেলে। দড়ি ছিঁড়ে ফেলে, পোস্টার ফেলে দেয়। পুলিশ বলে এখানে দোকান করা যাবে না।

    ওই বিক্রেতার সঙ্গে নাকি তাদের চুক্তি হয়েছে। তিনি হতাশ হয়ে, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। প্রতিজ্ঞা করলেন নিরাশ হওয়া যাবে না। নতুন একটা বুদ্ধি বের করলেন। মকবুলকে দিয়ে একটা লাঠির সঙ্গে পোস্টার টাঙিয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়াতেন। শুরু হলো নতুন সাধনা। ছেলেটা লাঠির সঙ্গে পোস্টার বেঁধে হাঁটে আর তিনি পেছন পেছন গুছানো পোস্টার নিয়ে হাঁটেন। আজাদের ভাষায় এ এক অদ্ভুত নেশা, ব্যবসা করার নেশা!

    হাঁটতে হাঁটতে একদিন বায়তুল মোকাররমের কেএল জুয়েলার্সের সামনে একটা একটা জায়গা ঠিক করলেন। ওই দোকানটি তখন বন্ধ ছিল। দোকানের সাঁটারের সঙ্গে রশি টানিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে নির্দিষ্টভাবে পোস্টার বিক্রি করা শুরু করলেন। বিপত্তি বাধলো সেখানেও মাস্তান ধরনের এক লোক এসে তাকে বাধা দিল। কিন্তু দোকান মালিক দুলালের সহযোগিতায় তিনি ওখানেই স্থায়ীভাবে বসার সুযোগ পেলেন।

    মাঝে মধ্যে বিভিন্ন মেলাতেও যেতেন। ভিতরে ঢুকতে না দিলে গেটে দাঁড়িয়ে বিক্রি করতেন। প্রচন্ড শারীরিক পরিশ্রম করতেন। তবুও হাল ছাড়েননি। দিন শেষে বিক্রির টাকা হাতে পেলেই যেন সব কষ্ট ভুলে যেতেন। নিজে থেকে গর্বিত হতেন যে সৎভাবে বেঁচে থাকার জন্য কিছু একটা করছেন। প্রায় ৪ মাস ব্যবসার পর ৫০ হাজার টাকার মতো লাভ ক্যাপিটাল বানালেন।

    দিন দিন পোস্টার বিক্রি বাড়তে লাগলো। ক্রমে পরিচিতি পেলেন, লোকবল বাড়লো, বেড়ে চললো মূলধনও। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, পোস্টারগুলো আসে ব্যাংকক থেকে। তখন চিন্তা করলেন তিনিও যদি ব্যাংকক যেতে পারতেন, সেখান থেকে পোস্টার আনতে পারতেন, তবে আরও বেশি লাভ করতে পারতেন।

    ১৯৭৬-৭৭ সালের কথা। বিটিভিতে প্রচারিত সিক্স মিলিয়ন ডলারম্যান সিরিজের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। হু হু করে বিক্রি হয়ে যেত সিরিজের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভিউকার্ড আর পোস্টার। তখন তিনি ভাবলেন বিদেশি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মতো দেশীয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরও অনেকেরই তো জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। এদের পোস্টার, ডিউকার্ডও বিক্রি হবে নিশ্চয়।

    ওই সময় রাজ্জাক, আফজাল, সুবর্ণা ছিল খুবই জনপ্রিয় স্টার। এদের পোস্টার, ভিউকার্ড বানানো গেলে ভক্তরা নিশ্চয় কিনবে, ওই সময় বিটিভির জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সকাল-সন্ধ্যা তখন আলোচনার শীর্ষবিন্দুতে। পীয়ূষ-আফরোজা জুটিও জনপ্রিয়। কিন্তু কই পাবেন তাদের ছবি? কিভাবে পাওয়া সম্ভব- সে ব্যাপারে গ্রাম থেকে আসা আজাদের কোন ধারণাই ছিল না।

    একদিন ফুটপাতে ‘তারকালোক’ পত্রিকার প্রচ্ছদে পীষূষ-আফরোজার ছবি দেখলেন। পত্রিকাটি উল্টে পাল্টে দেখলেন ভেতরে আফজাল, সুবর্ণা, রাজ্জাক পরিবারের ছবি। কিন্তু একজন ফুটপাতের ব্যবসায়ী হিসেবে তাদের কাছে পৌঁছতে কি পারবেন- এমন শঙ্কা তাকে ঘিরে ফেললো। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যেভাবেই হোক তাদের কাছে পৌঁছতেই হবে।

    পত্রিকা থেকে ঠিকানা নিয়ে ছুটে গেলেন নীলক্ষেতে ‘তারকালোক’ অফিসে। মালিক অফিসে ছিলেন না। ওই সময় অফিসে ছিলেন সাযযাদ কাদির। তিনি তার পরিকল্পনার কথা বলতেই বললেন আপনার উদ্যোগ ভাল। আজাদ বলেন, সাযযাদ কাদির ছিলেন খুবই ভাল মানুষ। তিনি বললেন এটি মালিকের এখতিয়ারে। পরে মালিক আরেফিন বাদলের কথা মতো মাঝি ভাই পীযূষ-আফরোজা, আফজাল-সুর্বণা ও রাজ্জাক পরিবারের ছবি দিলেন।

    এরপর ব্যাংককে পৌঁছে পোস্টার বিক্রির জায়গাটা খুঁজে বের করলেন। দেখলেন ঢাকায় যে পোস্টার ১২ টাকা দিয়ে কিনতেন। সেটা ব্যাংককে মাত্র ২ টাকা। সবমিলিয়ে ঢাকায় আনতে পোস্টার প্রতি খরচ ৬ টাকা। শুরু হলো ব্যাংকক থেকে পোস্টার এনে বিক্রি করা।এদিকে সকাল-সন্ধ্যার জনপ্রিয় জুটি আফরোজা বানু ও পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি, নায়করাজ রাজ্জাকের পরিবার এবং আফজাল-সুবর্ণার ছবি ব্যাংকক থেকে প্রসেস করে এনে পোস্টার ও ভিউকার্ড হিসেবে ছাপাতে লাগলেন।

    কিন্তু এবার সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়। যে দোকানের সামনে তিনি পোস্টার বিক্রি করতেন সেই দোকানটি খুলে দেয়া হলো। আইনি জটিলতার কারণে ৪ মাস দোকানটি বন্ধ ছিল। তিন দিন তিনি ব্যবসা করতে পারলেন না। পরদিন দোকান মালিক দুলাল ডেকে আন্তরিকার সঙ্গে বললেন, আমি তো দোকান খুলেছি, আপনি সামনের ওই খাম্বাটার সঙ্গে পোস্টার ঝুলিয়ে বিক্রি করতে পারেন।

    তখন তিনি তাই করলেন। এ সময় তিনি বিজ্ঞাপনও দিলেন আজাদ হাউজের নামে। অথচ আজাদ হাউজ বলতে ফুটপাতের খাম্বাটা। কেউ পরিহাস করলো আর কেউ কেউ উৎসাহও দিলেন। প্রথম দিকে বাধাও এলো। কয়েকটি পত্রিকায় রিপোর্ট হলো আজাদ নামে এক ছেলে পোস্টার-ভিউকার্ড ছাপানোর নামে দেশে অপসংস্কৃতি আমদানি করছে!

    কিন্তু ব্যাপারটা শাপেবর হয়ে দাঁড়ালো- হু হু করে বিক্রি হতে লাগলো পোস্টার আর ভিউকার্ড। এক সময় এমনভাবে চলতে লাগলো, চাহিদামতো ছাপাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। তারপর ১৯৮২ সালে এসে প্রতিষ্ঠিত হয় আজাদ প্রোডাক্টস। এরপর ডায়রি, দাওয়াতপত্র, বিভিন্ন কার্ড ছাপানো শুরু হয়। আবুল কালাম আজাদ সফল মায়েদের জন্য চালু করেছেন রত্নগর্ভা মা পুরস্কার। ২০০৩ সাল থেকে তিনি এ পুরস্কার দিয়ে আসছেন।

    তিনি বলেন, ছোট বেলায় মাকে হারানোয় তিনি আমার এ সাফল্য দেখে যেতে পারেন নি। তাই তাকে স্মরণ করে এ পুরস্কার চালু করেছি। একজন সুসন্তান তৈরিতে মায়ের ভূমিকায় সবচেয়ে বেশি থাকে। মা সচেতন হলে সন্তান যোগ্য হবে এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে মাকে তার প্রাপ্য মূল্য এবং তার কর্মের স্বীকৃতি দেয়ায় এর মূল লক্ষ্য।

    আজাদ নিজ উদ্যোগে মসজিদ মাদরাসা, স্কুল, কলেজসহ জনস্বার্থে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এ সাফল্যের পেছনে কারণ কি জানতে চাইলে আবুল কালাম আজাদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, শরীয়তপুর যাওয়ার সময় আমার পুকুরপাড়ে দু’হাত তুলে কাছে বলেছিলেন আল্লাহ তুমি আমার ছেলেকে দেখ। আমার মায়ের দেয়া সেদিন কবুল হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, আমার পুঁজি ছিল অল্প, কিন্তু সততা, নিষ্ঠা, শ্রম আর বুদ্ধির সংযোগ আমাকে এতদূর এনেছে।

    আমি সবসময় পাওনা শোধ করতাম চাওয়ার আগেই নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। তাতে করে যে আস্থা অর্জন করেছিলাম, তা পরে বহুভাবে উপকারে এসেছে। পণ্যের মান রক্ষায় আমি বরাবরই আপসহীন। আমি মনে করি, সবার সব ধরনের কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। কোন কাজই ছোট নয়, অবহেলার নয় এই চিন্তা একদিন আপনাকেও পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে। আজাদ বলেন, জীবনে প্রতিবন্ধকতা আসবেই, কিন্তু থেমে থাকলে চলবে না। ওপরে ওঠার জিদ থাকলে সে সফল হবেই। তথ্যসূত্র: ইন্টারনটে।

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    Archive Calendar

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০